বাস্তব মানসিকতা

বাস্তব মানসিকতা

— দিনকাল কী পড়ল বলুন তো মশাই! কোথাও তো আর টেকা যাচ্ছে না!

— কেন বলছেন মশাই? কী হয়েছে?

— আর কী বলব বলুন! এই তো কাল অফিস থেকে ফেরার সময় ট্রেনে দেখলাম, একজন লোক দুঃস্থ মানুষদের সাহায্যের জন্য টাকা তুলছে। এখন বলুন দেখি, চাইলেই কি আর সবাইকে টাকা দেওয়া যায়?

কাল বন্ধুদের সঙ্গে ইডেনের ম্যাচ দেখতে যাওয়ার টিকিট কেটেছি। খেলা শেষে বাইরে খাওয়া-দাওয়ারও পরিকল্পনা আছে। কত খরচ হবে বলুন তো! তাই যেখানে-সেখানে টাকা নষ্ট করা কি সম্ভব?

তার ওপর কয়েকদিন আগের কথাই ধরুন। সেদিনও অফিস থেকে ট্রেনে করে বাড়ি ফিরছিলাম। কয়েকজন লোক ট্রেনে উঠে বলল, কোথায় যেন ভয়ংকর ঝড় হয়েছিল, সেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য টাকা তুলছে।

কিন্তু সেদিনও টাকা দিতে পারিনি।

গত সপ্তাহে কত সুন্দর একটা ব্লকবাস্টার হলিউড সিনেমা দেখে এলাম। সিনেমা শেষ করে সোজা কেএফসিতে খাওয়া-দাওয়া। সব মিলিয়ে বেশ ভালোই খরচ হয়েছে। তাই সেদিন আর টাকা দিতে ইচ্ছে করল না। কী আর করা যাবে বলুন, সুন্দর করে ঘুমের অভিনয় করে পুরো ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলাম।

আরে মশাই, শুধু এসব খরচই কি আছে নাকি?

গার্লফ্রেন্ডের জন্য উপহার কিনতে হয়, তার আবদার মেটাতে হয়, নিজের খরচ আছে, বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি আছে—সব মিলিয়ে কম খরচ হয় নাকি?

তাই এসব সাহায্য-টাহায্যের পেছনে টাকা খরচ করার মতো অবস্থা আমার নেই।

কিন্তু চাইলেই কি সব সময় পালিয়ে থাকা যায়?

এই তো সেদিন একদল লোক সোজা অফিসে চলে এল। কী যেন বলল—কোনো এক অসুস্থ শিশুর চিকিৎসার জন্য ফান্ড তুলছে।

মনে মনে ভাবলাম, কার না কার কী হয়েছে, তার জন্য আবার টাকা দিতে হবে! কিন্তু অফিসের সবার সামনে তো আর মুখ ফিরিয়ে থাকা যায় না। তাই বাধ্য হয়ে কুড়ি টাকা দিয়ে দিলাম।

সবাই যদি ভাবে আমার মনটা খুব দয়ালু, তাহলে মন্দ কী! একটু সুনামও হলো।

অন্য সময় হলে কি আর দিতাম?

এমনিতেই কাল বন্ধুদের সঙ্গে দীঘা যাচ্ছি। কারণটা শুনবেন? আর বলবেন না!

আমি চাকরি পেয়েছি, তাই বন্ধুদের সবাইকে নাকি ট্রিট দিতে হবে। চাকরি পাওয়ার প্রায় দেড় বছর হয়ে গেল। আজ দেব, কাল দেব করে আর দেওয়াই হয়নি। তাই এবার ওদের একটাই দাবি—দীঘা ট্রিপের অর্ধেক খরচ নাকি আমাকেই দিতে হবে।

কী আর করা যায় বলুন, বন্ধু বলে কথা!

তাই এসব ফালতু বিষয়ে টাকা খরচ করার কোনো মানে দেখি না।

এবার আমার পাঠকবন্ধুদের কাছে একটা প্রশ্ন।

পুরো কথাগুলো পড়ে আপনাদের কি মনে হচ্ছে, এই ছেলেটার মতো মানসিকতার মানুষ কি সত্যিই থাকতে পারে?

যদি বলি, পারে।

আর একটু ভেবে দেখলে হয়তো বুঝবেন, সেই মানুষটি আমাদের মধ্যেই কেউ একজন। এমনকি, কখনও কখনও সেই মানুষটি হয়তো আমরা নিজেরাই।

রাগ করছেন?

আচ্ছা, একটু নিজের কথা ভেবে দেখুন তো।

আপনি বছরে কত টাকা নিজের প্রয়োজনের বাইরে শুধুমাত্র শখ পূরণের জন্য খরচ করেন? সিনেমা, রেস্তোরাঁ, ঘোরাঘুরি, পার্টি, দামি পোশাক, মোবাইল, উপহার—সব মিলিয়ে সেই খরচের পরিমাণ কত দাঁড়ায়?

এবার নিজেকে আরেকটা প্রশ্ন করুন—

সেই তুলনায় আপনি কত টাকা অসহায় মানুষের সাহায্যের জন্য দেন?

হয়তো উত্তরটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক হবে না।

অবশ্যই জীবনে আনন্দের প্রয়োজন আছে। নিজের শখ পূরণ করা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, ঘুরতে যাওয়া—এসবও জীবনেরই অংশ। কিন্তু সেই আনন্দের খরচ থেকে যদি সামান্য কিছু টাকা আমরা অসহায় মানুষের জন্য আলাদা করে রাখতে পারি, তাহলে কি সত্যিই আমাদের জীবনে খুব বড় কোনো ক্ষতি হবে?

হয়তো একটি সিনেমার টিকিটের টাকা, একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার খরচ, কিংবা পার্টিতে অতিরিক্ত খরচ করা সামান্য কিছু টাকা কারও চিকিৎসার কাজে লাগতে পারে।

আপনার দেওয়া সেই সামান্য অর্থ হয়তো কোনো শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে। কোনো অসহায় পরিবারকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে সাহায্য করতে পারে। কোনো বিপর্যস্ত মানুষের মুখে ফিরিয়ে আনতে পারে হাসি।

আমরা সবাই বড় বড় কাজ করতে পারি না। কিন্তু ছোট ছোট সাহায্য তো করতে পারি।

সাহায্য করার জন্য সব সময় অনেক টাকা থাকা দরকার হয় না। দরকার শুধু একটু ইচ্ছা, একটু মানবিকতা আর অন্যের কষ্ট বোঝার মতো একটি মন।

তাই পরের বার কেউ সাহায্যের জন্য হাত বাড়ালে, নিজের শখের খরচের কথা একবার মনে করুন। তারপর নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান।

কারণ, আপনার কাছে যে টাকা সামান্য—কোনো একজন মানুষের কাছে সেটাই হয়তো বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।

বাকিটা আপনার সিদ্ধান্ত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top