ছিমছাম গড়নের চৌকস ছেলে আরিফ। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার প্রতি তার ছিল গভীর আগ্রহ। গল্প, কবিতা কিংবা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখালেখি—সবকিছুতেই তার ছিল সমান আগ্রহ। বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখার পাশাপাশি নিজের লেখাগুলো নিয়েও ব্যস্ত থাকত সে।
আরিফের এসএসসি জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে রংপুরে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি দুই বন্ধুকে নিয়ে একটি ছোট ম্যাগাজিন সম্পাদনার কাজ শুরু করেছিল। শুরুতে খুব বেশি মানুষ তাদের পত্রিকা পড়ত না। কিন্তু তাদের লেখা ও বিষয় নির্বাচনের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই পাঠকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় মাসেই সেই ম্যাগাজিনের পাঠক সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়।
আরিফের এই সাফল্যে অনেকে খুশি হলেও কয়েকজন বন্ধু ছিল ভিন্নমত। তারা আরিফকে হিংসা করত এবং তাকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালাত। কিন্তু এসব নিয়ে আরিফ কখনো মাথা ঘামাত না। নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস রেখেই সে এগিয়ে যেতে চাইত।
নিজের লেখা একটি কবিতার কয়েকটি লাইন আরিফের ভীষণ প্রিয় ছিল। সুযোগ পেলেই মনে মনে আবৃত্তি করত—
“সুজনে সুবিননে বাঁধিব তোমার ঘর,
ভালোবাসার পরশ মেখে দূর হবে অশান্তির ঝড়।”
দেখতে দেখতে এসএসসি পরীক্ষা চলে এল। ভালো পরীক্ষা দিলেও সামান্য কিছু ভুলের কারণে আরিফ এ-প্লাস পেতে পারল না। আর এতেই যেন তার হিংসুক বন্ধুদের আনন্দের সীমা রইল না। তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা শুরু করল।
আরিফ অবশ্য তাতেও ভেঙে পড়ল না। বরং হাসতে হাসতে তাদের উদ্দেশে নিজের কবিতার কয়েকটি লাইন শুনিয়ে দিল—
“আমি হলাম ছন্নছাড়া,
ফুলছাড়া ফুলদানি।
আমার কথা ভাবে না কেউ,
সেটা আমি জানি।
সাঁঝ প্রভাতে নিভৃত নির্জনে
বন্ধু তোদের কথা পড়বে আমার মনে,
তখন ভাবব আমি তো আছি তোদের পাশে।”
এসএসসি শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য আরিফ ঢাকায় চলে গেল। জীবনের নতুন অধ্যায় যেন সেখান থেকেই শুরু হলো। ইন্টারমিডিয়েটের দুই বছর কেটে গেল লেখালেখি, পড়াশোনা আর নানা সৃজনশীল কাজে। জাতীয় পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করল। পাশাপাশি কয়েকটি বাংলা ও ইংরেজি ম্যাগাজিনে স্টাফ রাইটার হিসেবেও কাজ করার সুযোগ পেল সে।
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতেও ভালো ফল করে একটি নামকরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো আরিফ। সেখানে গিয়েও তার লেখালেখি থামল না। সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে লিখতে লিখতে একসময় তার লেখার সঙ্গে পরিচয় হলো জলি নামের এক তরুণীর।
জলি ছিল অত্যন্ত ভালো মনের মেয়ে। তার সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে ছিল এক ধরনের শান্ত স্বভাব। আরিফের লেখাগুলো সে খুব পছন্দ করত। ধীরে ধীরে লেখার সূত্র ধরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হলো। দুজনের মধ্যে চলত নানা রকম খুনসুটি আর গল্প।
জলি প্রায়ই তার বোন ইরার কাছে আরিফের কথা বলত। একদিন ইরা জলিদের বাড়িতে এলে দুজন আবার আরিফকে নিয়ে গল্পে মেতে উঠল।
ইরা অবাক হয়ে বলল,
“একজন মানুষের এত গুণ কীভাবে থাকতে পারে? লেখালেখি করে, পত্রিকা সম্পাদনা করে, আবার প্রোগ্রামিংও জানে!”
জলি হেসে বলল,
“আমিও মাঝে মাঝে ভাবি, এত কিছু করার পর ও ঘুমায় কখন!”
কথার ফাঁকে তারা আরিফের লেখা একটি কবিতা পড়তে শুরু করল। কবিতাটি ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা নিয়ে। কবিতার শুরুতেই ফুটে উঠেছিল গভীর আবেগ—
“মন যে আমার ব্যাকুল হায়,
পাগল যেতে সোনার মদিনা।
নবীর কদমে দিব সালাম,
হৃদয়ের বাসনা।”
কবিতাটি পড়তে পড়তে ইরা মুগ্ধ হয়ে গেল। শেষ করে সে বলল,
“ছেলেটা সত্যিই নবীপ্রেমিক। আবার দেখো, সব ধরনের বিষয় নিয়েই লিখতে পারে!”
আরিফের লেখা, তার চিন্তাভাবনা আর নানা প্রতিভা নিয়ে গল্প করতে করতে কখন যে রাত এগারোটা বেজে গেছে, তারা কেউ টেরই পেল না। জলির মা এসে দুজনকে রাতের খাবারের জন্য ডাকলেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষে তারা ঘুমাতে গেল। কারণ পরদিন সকালেই তাদের ময়মনসিংহ যেতে হবে। জলি কিছু জামাকাপড় কিনবে, আর তার সঙ্গে আরিফের সম্পাদিত বই ‘অর্কিড’-এর পাণ্ডুলিপিও কিনতে হবে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্রুত প্রস্তুত হয়ে তারা রওনা দিল। ট্রেনে বসে জানালার পাশে তাকিয়ে তারা উপভোগ করছিল বাংলার চিরচেনা প্রকৃতি। সবুজ মাঠ, গাছপালা আর দূরে ছুটে চলা গ্রামের দৃশ্য দেখতে দেখতে জলি হঠাৎ শামসুর রহমানের বিখ্যাত ট্রেনের কবিতাটি গুনগুন করে গাইতে শুরু করল—
“ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে ওই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে,
ট্রেনের বাড়ি কই?”
ইরা হেসে বলল,
“কবি আসলে ঠিকই বলেছেন। ট্রেনে ভ্রমণের আনন্দই আলাদা।”
গল্প করতে করতে কখন যে তারা ময়মনসিংহে পৌঁছে গেল, কেউ বুঝতেই পারল না।
স্টেশনে নেমে তারা প্রথমে নিউ মার্কেটে গেল। জলি ও ইরা পছন্দ করে একটি করে সুন্দর শাড়ি কিনল। এরপর থ্রি-পিস কেনার পর তারা সোজা বইয়ের দোকানে চলে গেল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা নিজেদের পছন্দের দুটো বই কিনল। তবে জলির আসল আগ্রহ ছিল আরিফের সম্পাদিত ‘অর্কিড’ বইটি হাতে পাওয়া।
কেনাকাটা শেষে দুজন ফুচকার দোকানে বসে বেশ জমিয়ে ফুচকা খেল। সারাদিনের ঘোরাঘুরি শেষে বিকেলের ট্রেনে তারা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।
বাড়িতে ফিরেই জলি আরিফকে ফোন করল।
“তোমার বই কিনে এনেছি,” জলি আনন্দের সঙ্গে বলল।
ওপাশ থেকে আরিফের কণ্ঠে খুশি ঝরে পড়ল। সে তাদের ধন্যবাদ জানাল।
ফোন রেখে জলি ফ্রেশ হয়ে বইটি হাতে নিল। তারপর বিছানায় বসে পড়তে শুরু করল। বইয়ের পাতায় পাতায় যেন সে খুঁজে ফিরছিল আরিফের চিন্তা, তার স্বপ্ন আর তার মনের কথাগুলো।
একসময় রাত গভীর হলো। কিন্তু জলি তখনও বইয়ের ভেতর ডুবে আছে।
‘অর্কিড’ শুধু একটি বই ছিল না—জলির কাছে সেটি হয়ে উঠেছিল আরিফ নামের এক অদ্ভুত প্রতিভাবান মানুষের চিন্তার জগতে প্রবেশের এক নতুন দরজা।
