প্রতি বছর শীত এলেই অনিকেতের দাদু আড়ংঘাটায় বেড়াতে যেতেন। সেখানে তাঁর শ্যালিকাদের বাড়ি ছিল। আড়ংঘাটার প্রতি দাদুর আলাদা টান ছিল, আর তার একটা কারণ ছিল সেখানে তাঁর নিজের কিছু জমিও ছিল। সেই জমি এখন দেখাশোনা করত তাঁর ছোট শ্যালিকার ছেলে কালা।
অনিকেত বহু বছর ধরেই দাদুর কাছে আবদার করে আসছিল আড়ংঘাটায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো অজুহাতে তাকে রেখে যাওয়া হতো। তাই একদিন দাদু যখন আবার আড়ংঘাটায় যাওয়ার কথা বললেন, অনিকেত আর সুযোগ ছাড়ল না।
“দাদু, এবার কিন্তু আমাকে সঙ্গে নিতেই হবে। স্কুলের ছুটি, টিউশনও বন্ধ। আমাকে না নিলে তোমার পিঠও আর ম্যাসেজ করে দেব না, তোমার ঘরেও আসব না!”
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগল সে।
দাদু হেসে বললেন,
“ঠিক আছে, নিয়ে যাব। তবে একটা শর্ত আছে। সেখানে গিয়ে কোনো বাঁদরামি করা চলবে না। আমি যা বলব, সেটাই শুনতে হবে।”
“আমি একদম চুপচাপ থাকব দাদু। তোমার সব কথা শুনব।”
দাদু বললেন, “তাহলে পরশু সকালেই বেরোব। ব্যাগ গুছিয়ে রাখিস।”
অনিকেতের আনন্দ আর ধরে না।
পরশুদিন সকাল ছয়টার মধ্যেই দাদু-নাতি রওনা দিল। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ সময়। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র অনিকেতের কাছে আড়ংঘাটা যেন বহুদিনের স্বপ্নের জায়গা।
সকাল দশটার মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল কালা কাকার বাড়িতে। অনিকেতকে দেখে বাবলু, রীতা আর ময়না—কালা কাকার ছেলেমেয়েরা—ভীষণ খুশি হয়ে গেল। এতদিন পরে সমবয়সী সঙ্গী পেয়ে অনিকেতও আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দাদু তখন বাড়ির বড়দের সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত। সুযোগ বুঝে অনিকেত বাবলুদের চোখের ইশারা করল।
“চল, ক্ষেতে যাব। তবে দাদুকে বলবি দোকানে যাচ্ছি। দাদু জানতে পারলে আমাকে আর বাইরে যেতে দেবে না।”
বাবলু, রীতা আর ময়না রাজি হয়ে গেল।
“ঠাকুমা, আমরা দোকানে যাচ্ছি। অনিকেতকেও নিয়ে যাচ্ছি।”
কথাটা বলেই চারজন ছুট দিল।
ক্ষেতে পৌঁছানোর পর অনিকেত যেন অন্য মানুষ হয়ে গেল। কখনো মাঠের এদিক, কখনো ওদিক—চারজনের দৌড়ঝাঁপ আর হাসাহাসিতে দুপুর একটা বেজে গেল। এতদিন যে জায়গায় আসার জন্য সে অপেক্ষা করেছিল, সেই জায়গা তার কল্পনার থেকেও সুন্দর মনে হলো।
দুপুরে বাড়ি ফিরে অনিকেত জানতে পারল, দাদু পাশের আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে গেছেন। রাতে ফিরবেন। অর্থাৎ বিকেলটা তার নিজের মতো কাটানোর সুযোগ রয়েছে।
বিকেল চারটার দিকে বাবলু, রীতা আর ময়নার কয়েকজন বন্ধুও ক্ষেতে এসে হাজির হলো। কিছুক্ষণ গল্প করার পর সবাই মিলে লুকোচুরি খেলার সিদ্ধান্ত নিল।
বড় মাঠ। চারদিকে গাছপালা, ঝোপঝাড় আর ফসলের ক্ষেত। সবাই যে যার মতো লুকিয়ে পড়ল। দৌড়, খোঁজাখুঁজি আর হাসিতে পুরো বিকেলটা কেটে গেল।
সন্ধ্যার আগে সবাই মাঠের এক পাশে গোল হয়ে বসে গল্প করছিল। তখনই কথার মধ্যে ভূতের প্রসঙ্গ উঠল।
কেউ বলল তার মামা ভূত দেখেছে, কেউ বলল তার বাবা রেললাইনের পাশে ভূত দেখেছে।
সবাই যখন নিজেদের গল্প শোনাতে ব্যস্ত, তখন রানা নামের একটি ছেলে হঠাৎ বলল,
“তোরা জানিস, এই ক্ষেতেও ভূত আছে?”
সবাই হেসে উঠল।
রানা এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
“ওই যে সামনে খালটা দেখছিস, ওটা কোনোদিন পুরো শুকায় না। কিন্তু শোনা যায়, প্রতি বছর ওই খাল একটা প্রাণ নেয়। মানুষ হোক কিংবা কোনো প্রাণী। যে বছর কেউ মারা যায় না, সে বছর নাকি খাল শুকিয়ে যায়।”
চারপাশ হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।
রানা আরও বলল,
“এই বছর এখনো ওই খাল কারও প্রাণ নেয়নি। তাই খালটা নাকি খুব ক্ষুধার্ত।”
অনিকেত এবার হো হো করে হেসে উঠল।
“এই যুগে আবার ভূত! তোরা এসব বিশ্বাস করিস?”
রানা বলল,
“বেশ সাহস তো! ওই সামনে তালগাছটা দেখছিস? সেখানে গিয়ে তিনবার বল—‘আমি ভূতে ভয় পাই না।’ দেখি কত সাহস!”
অনিকেত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল।
তালগাছের কাছে গিয়ে সে তিনবার বলল,
“আমি ভূতে ভয় পাই না। আমি ভূতে ভয় পাই না। আমি ভূতে ভয় পাই না।”
তারপর পিছনে ফিরে দেখল—বন্ধুরা কেউ নেই। সবাই অনেক দূরে চলে গেছে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। মাঠের আশেপাশে কোনো আলো নেই।
হঠাৎ অনিকেতের কানে ভেসে এল এক অদ্ভুত হাসি।
মৃদু… কিন্তু কেমন যেন ভয়ংকর।
অনিকেত আর দাঁড়াল না। এক দৌড়ে বাড়িতে ফিরে এল।
সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। দাদু শুলেন বাবলু ও কালা কাকার সঙ্গে, আর অনিকেত শুল গীতা পিসির ঘরে।
রাত তখন সাড়ে আটটা কিংবা নয়টা। অনিকেতের অবশ্য এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসে না।
কিছুক্ষণ পর তার বাথরুম পেল। সবাইকে না জাগিয়ে সে ধীরে ধীরে বাইরে গেল।
বাথরুম থেকে ফিরে ঘরে ঢোকার সময় হঠাৎ আবার সেই হাসির শব্দ!
অনিকেত পিছনে তাকাতেই দেখল—কেউ একজন দৌড়ে দূরে চলে যাচ্ছে।
তারপর বাতাসে ভেসে এল পরিচিত একটি গন্ধ।
এই গন্ধ সে বিকেলেই পেয়েছিল। রীতার জামা থেকে আসা সেই গন্ধ।
অন্ধকারের মধ্যে কোথা থেকে যেন একটি কণ্ঠ ভেসে এল—
“রীতা এক টিপ…”
অনিকেতের মনে হলো, হয়তো সবাই আবার লুকোচুরি খেলছে।
সে আর দেরি করল না। শব্দের পেছনে দৌড়াতে শুরু করল।
চাঁদের আলোয় সে দেখতে পেল, একজন মেয়ে ক্ষেতের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। পোশাক দেখে মনে হলো—সে রীতা।
“রীতা! দাঁড়া!”
কিন্তু মেয়েটি থামল না।
অনিকেতও পেছন পেছন দৌড়াতে লাগল। মেয়েটি সেই তালগাছের কাছে গিয়ে থামল। তারপর আচমকা সেখান থেকে ঝিলের দিকে চলে গেল।
অনিকেত ধীরে ধীরে কাছে গেল।
“রীতা?”
কোনো উত্তর নেই।
সে আরও কাছে এগিয়ে গেল।
আর ঠিক যখন রীতার গায়ে হাত দিতে যাবে, তখনই—
মেয়েটি চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল!
অনিকেত কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ তাকে প্রচণ্ড জোরে পেছন থেকে টেনে ধরল।
সে ঘুরে তাকিয়ে দেখল—দাদু!
দাদু তাকে একটি চড় মেরে ঘাড় ধরে বাড়ির দিকে নিয়ে গেলেন। সেদিন রাতে অনিকেত আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেল না।
পরদিন ভোরেই দাদু তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। সারাটা পথ দাদু কোনো কথা বললেন না।
বাড়িতে ফিরে অনিকেতকে প্রচণ্ড বকাঝকা ও মারধর করলেন। সবাই অবাক। কিন্তু দাদু কিছুই বললেন না। শুধু একবার বললেন,
“তোকে আর কোনোদিন আড়ংঘাটায় নিয়ে যাব না।”
এরপর বহু বছর কেটে গেল।
অনিকেতের মনে দাদুর প্রতি অভিমান জমে রইল। কেন সেদিন দাদু তাকে এভাবে মারলেন, কেন কিছু বললেন না—কিছুই সে বুঝতে পারেনি।
অবশেষে অনিকেত যখন একুশ বছরের যুবক, তখন একদিন সেই রহস্যের উত্তর পেল।
সেদিন রীতা তার বাবার সঙ্গে অনিকেতদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। গল্পের একপর্যায়ে পুরোনো সেই ঘটনার কথা উঠল।
অনিকেতের ঠাকুমা বললেন,
“সেদিন রাতে তুই গীতা পিসির ঘর থেকে বেরিয়ে রীতাকে দেখে তার পেছনে ছুটেছিলি। তোর দাদু যদি তোকে সময়মতো না ধরত, সেদিন তোকে বাঁচানো যেত না।”
অনিকেত স্তব্ধ হয়ে গেল।
তখন দাদু নিজেই মুখ খুললেন।
“সেই রাতে আমারও ঘুম আসছিল না। হঠাৎ বাইরে থেকে একটা ফিসফিসে আওয়াজ শুনলাম—‘তোর নাতিকে নিয়ে গেলাম। বাঁচাতে পারলে বাঁচিয়ে নে।’”
“আমি বাইরে এসে দেখি তুই ক্ষেতের দিকে দৌড়াচ্ছিস। আমি পেছন পেছন ছুটলাম। অনেক কষ্টে তোকে ঝিলের কাছে ধরে ফেলি।”
দাদু একটু থামলেন।
“ফেরার সময় ওই তালগাছটার দিকে তাকিয়ে দেখি, গাছের মাথায় একজন বসে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছিল না। শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে পা দোলাচ্ছিল।”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
রীতা তখন ধীরে ধীরে বলল,
“কিন্তু আমি তো সেদিন রাতে বাইরে বেরই হইনি!”
দাদু শান্ত গলায় বললেন,
“আমি জানি। ওটা তুই ছিলি না। ওটা তোর রূপ ধরে এসেছিল।”
কথাগুলো শুনে অনিকেতের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
যে দাদুকে এত বছর সে কঠোর ও নিষ্ঠুর মনে করে এসেছে, সেই মানুষটিই সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।
অনিকেতের বুকটা ভার হয়ে এল।
তার শুধু একটাই ইচ্ছে হচ্ছিল—দৌড়ে গিয়ে দাদুকে জড়িয়ে ধরে বলবে,
“দাদু, আমাকে ক্ষমা করো।”
কিন্তু এত বছর পরও তার মনে একটা প্রশ্ন রয়ে গেল—
দাদু কি সত্যিই তাকে ক্ষমা করবেন?
