বাইরে বৃষ্টি যেন আরও বেড়েই চলেছে। টিনের চালে একটানা ঝমঝম শব্দ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি আর তার কয়েক মুহূর্ত পরেই বিকট মেঘের ডাক। তার ওপর অনেকক্ষণ আগেই কারেন্ট চলে গেছে।
দাদু চেয়ারে বসে চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে বলল,
— দাদুভাই, আজ আর কারেন্ট আসবে না। এটা তো আর শহর নয় রে, যে কারেন্ট গেলেই কিছুক্ষণ পর আবার চলে আসবে। টুকাই, যা বাবা, লন্ঠনটায় একটু তেল ভরে নিয়ে আয়।
টুকাই আমার মামার ছেলে। সে লন্ঠনটা নিয়ে ভেতরে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর লন্ঠনে তেল ভরে নিয়ে ফিরে এল টুকাই। দাদু চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। আমি আর টুকাই দুজনেই একদৃষ্টিতে দাদুর দিকে তাকিয়ে আছি।
দাদু গল্প শুরু করার আগেই হঠাৎ রেগে বলল,
— ওরে শালা! ভূতের গল্প শুনবি আর এত আলো জ্বালিয়ে রাখবি? যা, লন্ঠনের শিখাটা একটু কমিয়ে দে।
মা বলে, দাদু যখন ভূতের গল্প বলে, তখন গল্পের আগে নাকি একটু পরিবেশ তৈরি করতে হয়।
টুকাই লন্ঠনের শিখা কমিয়ে দিল।
সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতর একটা অদ্ভুত ভৌতিক পরিবেশ তৈরি হলো। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি, টিনের চালে তার একটানা শব্দ। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি, তারপরই মেঘের গর্জন। জানালা দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস ঢুকে লন্ঠনের শিখাটাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
দাদু এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
— শোন টুকাই, এটা কোনো বানানো গল্প নয়। এটা আমার ছোটবেলার ঘটনা। তখন আমার বয়স কত হবে—এই এগারো কি বারো বছর।
এক শীতের রাতে ঠিক এমনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আমি আর আমার কাকার ছেলে পঁচা ঠিক করলাম, পরদিন ভোরে উঠে তাল কুড়াতে যাব।
তোরা এখন কী বুঝবি তাল কুড়ানোর মজা! আম কুড়ানোর মতোই ছিল ব্যাপারটা। একটু দেরি করলেই অন্য ছেলেরা সব কুড়িয়ে নিয়ে যেত। পাঁচ-ছয়টা ছেলের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে আম, জাম বা তাল কুড়ানোর সেই আনন্দই ছিল আলাদা।
যেমন ভাবা, তেমন কাজ। পরদিন ভোররাতে আমরা দুজন বেরিয়ে পড়লাম। হাতে একটা লন্ঠন, আর সঙ্গে একটা বড় ব্যাগ।
কুয়াশায় ঢাকা, বৃষ্টিতে ভেজা কাঁচা রাস্তা। কাদায় বারবার পা পিছলে যাচ্ছিল। কোনোরকমে বাঁশবনের পাশের তালবাগানে গিয়ে পৌঁছলাম।
মুখার্জিদের তালবাগানে তখনও সাত-আটটা তালগাছ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
পঁচা চারদিকে তাকিয়ে বলল,
— এখনও কেউ আসেনি রে ভোলা! অনেক তাল কুড়ানো যাবে। তুই সামনের গাছগুলো থেকে শুরু কর, আমি ওই দিকের গাছগুলো দেখি।
আমি তাল কুড়িয়ে ব্যাগে ভরতে শুরু করলাম। প্রায় ছয়-সাতটা তাল ব্যাগে ঢুকিয়েছি, এমন সময় হঠাৎ পঁচার গলার চিৎকার শুনতে পেলাম।
— দে! এটা আমায় দে!
লন্ঠনটা হাতে নিয়ে আমি পঁচার দিকে দৌড়ে গেলাম।
দূর থেকেই দেখতে পেলাম, বাঁশবনের পাশে শেষ তালগাছটার নিচে পঁচা আর একজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে। ঘন কুয়াশার কারণে লোকটাকে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না।
আমি কাছে পৌঁছানোর আগেই অচেনা ছেলেটা পঁচাকে সপাটে একটা চড় মেরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর দৌড়ে বাঁশবনের ভেতর ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
পঁচা মাটি থেকে উঠে চিৎকার করে বলল,
— দাঁড়া ব্যাটা! একবার ধরতে পারলে বুঝিয়ে দেব, কার সঙ্গে পাঙ্গা নিয়েছিস!
তারপর আমরা তালভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।
কিছুক্ষণ পর সূর্য উঠল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর থেকেই পঁচা বলল,
— ভাই, শরীরটা বড্ড যন্ত্রণা করছে।
দুপুর হতে না হতেই তার প্রচণ্ড জ্বর এল। কাকিমা মাথায় জলপট্টি দিয়েও জ্বর নামাতে পারল না। কাকু ডাক্তারকে খবর দিল।
বিকেলে ডাক্তার এসে ওষুধ দিয়ে গেলেন। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পঁচার জ্বর আরও বেড়ে গেল।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল কান্নার শব্দে।
বাইরে বেরোতেই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— পঁচা আর নেই রে ভোলা… পঁচা আর নেই।
কথাটা শুনে আমি যেন পাথর হয়ে গেলাম। বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত কষ্ট চোখের জল হয়ে বেরিয়ে এল।
ধীরে ধীরে কাকুর ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। ঘরে ঢুকে দেখি, পঁচা নিথর হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। কাকিমা তাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে।
কিছুক্ষণ পর গ্রামের সবাই এসে জড়ো হলো। ডোমদের ডাকা হলো। তারা মাঁচা নিয়ে এল। খই ছিটাতে ছিটাতে পঁচার শেষ বিদায় সম্পন্ন হলো।
পঁচার মৃত্যুর বেশ কয়েকদিন পরের ঘটনা।
সেদিন রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমি আর কাকিমা ঘুমিয়ে ছিলাম। কাকু ব্যবসার কাজে বাইরে গিয়েছিল।
আমি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একটা অদ্ভুত শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।
কাকিমার দিকে তাকিয়েই বুঝলাম, সে ভীষণ আতঙ্কিত। তার চোখ যেদিকে স্থির হয়ে আছে, আমিও সেদিকে তাকালাম।
ভয়ে আমার হাত-পা অবশ হয়ে গেল।
লন্ঠনের মৃদু আলোয় দেখতে পেলাম—একটা ছোট বাচ্চা ছেলের মতো কালো ছায়ামূর্তি গোটা ঘরের মধ্যে পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছে। কখনও জানালার কাছে গিয়ে বসছে, আবার কখনও দোল খাচ্ছে।
সমস্ত সাহস একত্র করে কাঁপা গলায় আমি বললাম,
— ও… ও… ওটা কে?
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা।
তারপর কাকিমা খুব নিচু স্বরে বলল,
— চুপ করে শুয়ে থাক।
আমি দম বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।
ছায়ামূর্তিটা কখনও হাসছে, কখনও কাঁদছে। আবার পরক্ষণেই জানালায় বসে দুলছে।
কতক্ষণ এভাবে কেটেছিল জানি না। হঠাৎ গোটা ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
আমি আস্তে আস্তে চারদিকে তাকালাম।
ছায়ামূর্তিটা আর ঘরের মধ্যে নেই।
ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। জলের গ্লাসটার দিকে হাত বাড়াতে যাব, ঠিক তখনই দরজার বাইরে কিছু একটা ঘষটে চলার শব্দ পেলাম।
মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাতেই দেখলাম, বাইরে থাকা লন্ঠনটা যেন কেউ টেনে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তারপর হঠাৎ লন্ঠনের আলো নিভে গেল।
গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেল গোটা ঘর।
বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়তে লাগল। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে এল।
তারপর আর কিছু মনে নেই।
পরদিন সকালে মায়ের ডাকে আমার জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলতেই দেখলাম, ঘরের সবাই আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।
ঠাকুরমা কোথা থেকে ফুল আর বেলপাতা এনে আমার কপালে ঠেকিয়ে কাঁপা গলায় বলছেন,
— হে ঠাকুর, আমাদের রক্ষা করো… রক্ষা করো।
ঠাকুরদা রাগে ও আতঙ্কে চিৎকার করে বললেন,
— নিমাইকে তো পাশের গ্রামে সাধু মহারাজকে আনতে পাঠিয়েছি! এখনও ফিরল না কেন?
বিকেলের দিকে বাবা আর সাধু মহারাজ বাড়িতে এলেন।
সবাই হাতজোড় করে তাঁর সামনে বসে পড়ল। ঠাকুরদা পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন।
সাধু মহারাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
— মা, তোর ঘরে অশুভ শক্তি আছে। আমি এই ঘরে কোনো ভোজন বা জল গ্রহণ করতে পারব না।
এরপর তিনি আসনে বসে চোখ বন্ধ করলেন। নিজের ঝুলি থেকে একটি বোতল বের করে কিছু জল হাতে নিয়ে মন্ত্র পড়তে লাগলেন। তারপর বললেন,
— জয় মা!
জল ছিটিয়ে দিলেন ঘরের চারদিকে।
কিছুক্ষণ পর ঠাকুরমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মা, তোর ঘরের একটা অংশ আমি আমার শক্তি দিয়ে বেঁধে দিয়েছি। আজ রাতটা ওই জায়গার মধ্যে থাকলে তোদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু মনে রাখিস, এই সুরক্ষা শুধু আজ রাতের জন্য।
ঠাকুরদা কাঁপা গলায় বললেন,
— বাবা, এর কোনো প্রতিকার নেই?
সাধু মহারাজ এবার ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— আছে জগা। এই গৃহ তুই ত্যাগ কর। এই গৃহ আর থাকার যোগ্য নয়।
এই বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন। বাবা তাঁর পেছন পেছন চলে গেল।
সেই রাতে সবাই এক জায়গায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়ে থাকল। লন্ঠনের শিখা আজ আর কেউ কমাল না।
কেউ ঘুমোতে পারছিল না।
অনেকক্ষণ পর আমার চোখটা একটু লেগে এসেছিল। হঠাৎ রান্নাঘরের ভেতর থেকে মাটিতে কিছু একটা ছুড়ে ফেলার শব্দ পেলাম।
কিন্তু ভয়ে কেউ উঠে দেখার সাহস করল না।
পরদিন সকালে দেখা গেল, রান্নাঘরের সমস্ত বাসনপত্র মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
ঠাকুরদা সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলেন,
— সবার ভালোর জন্য আজই এই বাড়ি ছেড়ে দেব।
এরপর কয়েকদিন আমরা গ্রামের মণ্ডলদের বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। তারপর ঘরামিকে ডেকে নতুন বাড়ি তৈরি করা হলো।
দাদুর গল্প শেষ হতে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— দাদু, ওই বাড়িটা এখন কোথায় আছে?
দাদু হেসে বলল,
— এখন শুয়ে পড়। কাল তোকে দেখিয়ে আনব।
পরদিন সকালে দাদু আমাকে সেই বাড়িটা দেখিয়ে নিয়ে গেল।
বাড়িটা দেখে আমার গা শিউরে উঠল।
এখনও সেটাকে সত্যিকারের ভূতুড়ে বাড়ি বলেই মনে হয়। অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি সেই পুরোনো বাড়ি চারদিক থেকে বড় বড় ঝোপঝাড়ে ঢাকা।
আর বাড়িটার ওপর জন্মেছে এক বিশাল বটগাছ।
তার মোটা মোটা শেকড়গুলো উপর থেকে নেমে এসে সাপের মতো গোটা বাড়িটাকে জড়িয়ে রেখেছে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ মনে হলো, সেই অন্ধকার জানালার ওপাশ থেকে কেউ যেন এখনও তাকিয়ে আছে…
ওটা কে?
